• বুধবার, ০৩ মার্চ ২০২১, ১২:০৪ অপরাহ্ন

ব্রেকিং নিউজ :
গৃহহীন অসহায় মমতাজকে টিম হাসিমুখের ঘর উপহার! বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার প্রতিবাদে ঢাকাসহ সারাদেশে যুবলীগের বিক্ষোভ দেশজুড়ে দৃষ্টিনন্দন ইসলামি ভাস্কর্য রামগঞ্জে দল্টা বাঙ্গালী ব্লাড ডোনার্স ক্লাবের উদ্যোগে ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্পিং নকল আওয়ামী লীগের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে আসল আওয়ামীলী লীগ’ বসুরহাট পৌরসভার জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ আবদুল কাদের মির্জা ‘তুরস্কের আঙ্কারায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ করা হবে’ যুবলীগ সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে অপপ্রচার থানায় জিডি ভাস্কর্য বিরোধীতার আগে শিশু বলাৎকার বন্ধ করুন: ডা. জাফরুল্লাহ কোম্পানীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান ইমাম রাসেল’র জন্মদিন উদযাপন

খেলাপি ঋণ কমেছে ‘কাগজে-কলমে’

  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২০ জুন, ২০২০

উচ্চ খেলাপির বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হয়েছে ১১টি ব্যাংক। চলতি বছরের মার্চ শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৬৩২ কোটি টাকায়। তাছাড়া এ সময় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কম দেখানো হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, খেলাপি ও প্রভিশন ঘাটতির এই সংখ্যা এখন অর্থহীন। করোনায় নতুন করে খেলাপি না করার নিয়মে ‘কাগজে-কলমে’ কমেছে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ। বাস্তবে পাহাড়সম খেলাপি ঋণে বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাত। এই অবস্থায় প্রভিশন ঘাটতি কম দেখালেও প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি উল্টো।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ঋণখেলাপির এই সংখ্যা এখন অর্থহীন। এটা কাগজে-কলমের কিছু সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই না। কারণ, এসব চিত্র বাস্তবতা পরিপন্থী।

জানা গেছে, ব্যাংকিং খাত সামগ্রিকভাবে প্রভিশন ঘাটতিতে পড়লেও ঘাটতি রয়েছে মূলত ১১ ব্যাংকের। বাকি ৪৮ ব্যাংকের ঘাটতি নেই; বরং অধিকাংশ ব্যাংকের উদ্বৃত্ত রয়েছে। ১১টি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রভিশন ঘাটতি বেসিক ব্যাংকের। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ২ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। এটাও কাগজে-কলমে। কারণ, বিশেষ ছাড় নিয়ে প্রভিশন ঘাটতি কম দেখানো হয়েছে। রূপালী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ৭৯৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত আরও দুটি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি ব্যাংকের ৬৮০ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৫৭০ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ২৮০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২৫৯ কোটি, ঢাকা ব্যাংকের ১৮২ কোটি এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের ঘাটতি ৯৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া আরও একটি বেসরকারি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ৪৮৭ কোটি টাকা। এই ১১টি ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ৮ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ঘাটতি থাকলেও মার্চে কোনো ঘাটতি নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২৪ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ৯২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বরে ১০ লাখ ১১ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপির অঙ্ক ছিল ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ কমেছে ১ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছরের মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। ওই সময়ে বিতরণ করা ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা ঋণের ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ ছিল খেলাপি। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ কমেছে ১৮ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। অথচ গত এক বছরে প্রকৃতপক্ষে কোনো খেলাপি ঋণ আদায় হয়নি। গত বছরের ১৬ মে ঋণখেলাপিদের মোট ঋণের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সুদে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরে পরিশোধের সুযোগ দেয় সরকার। বিশেষ এই ছাড়ের আওতায় মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে ব্যাংকগুলো। এর অর্ধেকই করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংক। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েও গত বছর বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৭০-৭৫ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এর বাইরে মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন (রাইট অফ) করেছে ব্যাংকগুলো। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের হিসাব থেকে এই অর্থ বাদ যাবে, যদিও তা আর ফেরত আসছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অপর এক তথ্যে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০০ জন ঋণগ্রহীতা আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছেন।

ফলে ঋণখেলাপি হিসেবে তাদের নাম বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোতে (সিআইবি) উল্লেখ করা হয় না। এরকম ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। এই সব অদৃশ্য খেলাপি ঋণ যোগ করলে দেশে এখন প্রকৃত খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ থেকে দেশে মহামারী করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে থাকে। এই সংকটকালে ঋণগ্রহীতাদের বেশকিছু সুবিধা দিয়েছে সরকার; যা আগে থেকে যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি তারাও পাচ্ছেন। এটা হল আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কিস্তি না দিলেও কেউ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হবে না। এর আগে করোনাভাইরাসের কারণে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ঋণ শ্রেণীকরণে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। মহামারীর প্রকোপ দীর্ঘায়িত হওয়ায় আরও তিন মাস বর্ধিত করা হয়েছে। অর্থাৎ চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোনো ঋণের শ্রেণিমান পরিবর্তন করা যাবে না। যে ঋণ যে শ্রেণিতে আছে, সে অবস্থায়ই থাকবে। গত ১৫ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাত এখন নানামুখী চাপে। করোনার কারণে এ চাপ বাড়ছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পুরনো সংকট তো রয়েছেই। খেলাপি ঋণের বিপরীতে অনেক ব্যাংক প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। এতে আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ব্যাংকগুলোর উচিত খেলাপি ঋণ যেন না বাড়ে-এ জন্য নিয়মনীতি মেনে ঋণ বিতরণ করা। কারণ, খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হলে ব্যাংকের আয় ও মুনাফা কমে যায়। মূলধন ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, মার্চ পর্যন্ত ৯২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের মধ্যে ৮৭ শতাংশের বেশি আদায় অযোগ্য। অর্থাৎ মন্দমানের খেলাপি ঋণ ৮৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। ঋণ নিয়মশৃঙ্খলা সঠিকভাবে না-মেনে ঋণ দেয়ায় ব্যাংক খাতে বিপুল পরিমাণ খেলাপি হয়েছে। ঋণখেলাপি বাড়লেও জনগণের আমানত নিরাপদ রাখতে প্রভিশন পদ্ধতি চালু আছে। কোনো ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক তার আয় থেকে এনে প্রভিশন সংরক্ষণ করে। কিন্তু প্রভিশন সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হলে সমপরিমাণ আমানত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

মার্চ পর্যন্ত হিসাবে খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে ৬০ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সংরক্ষণ করেছে ৫৬ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। তবে সামগ্রিক ঘাটতি ডিসেম্বরের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ডিসেম্বরে প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৬ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা।

ব্যাংকাররা জানান, খেলাপি ঋণ বেশি থাকলে তার বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হয়। পরিচালন মুনাফা থেকে অর্থ এনে এটি সংরক্ষণ করে ব্যাংকগুলো। এতে পরিচালন মুনাফা বেশি হলেও নিট মুনাফা কমে যায়। ফলে শেয়ারহোল্ডাররা মুনাফা কম পান। আবার খেলাপি ঋণ বেশি হলে তহবিল ব্যয় (কস্ট অব ফান্ড) বেড়ে যায়। এতে ঋণের বিপরীতে বেশি সুদ এবং আমানতের বিপরীতে কম সুদ দিতে বাধ্য হয় ব্যাংকগুলো।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

http://digitalbangladesh.news/